সায়রে গর্জন । পর্ব - ০৭

হাসপাতালের চারদিকে কড়া নিরাপত্তা। ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে।
খুব ভোরে পাভেলের ফোন পেয়ে ছুটে আসে।
ডাক্তার মনিকা ফেরদৌস হামজার রিপোর্ট চেক করছে।
ছেলেটাকে এমন ভাবে কো/পা/নো হয়েছে ডাক্তাররা আতঙ্কিত।
শাহাদের মাথার ভেতর আগুন জ্বলছে। মনিকা শাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
শাহাদ ভাই, ছেলেটার প্রচুর ব্লি*ডিং হচ্ছে।
ওর পরিবারের লোকজনকে খবর দিয়েছেন?
পাভেল দিয়েছে,ওরা আসছে রাস্তায়।
যত ব্লা*ড দরকার নে আমার কাছ থেকে। হামজাকে সুস্থ চাই আমার।
অলরেডি দু ব্যাগ নিয়েছি আমি আপনার কাছ থেকে। এখন আর সম্ভব না।
শুন মনি আমার এত কথা বুঝার ও দরকার নাই,জানার ও দরকার নাই।
তোকে ডাক্তারি আমি এজন্য পড়াই নাই যে তুই প্রয়োজনে আমার কাজে লাগবি না।
যেখান থেকে পারিস ভালো ডাক্তার নিয়ে আয়,নিজেও হেল্প কর।
হামজাকে প্রয়োজন আমার।

জোরে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় শাহাদ। মনির মুখটা থমথমে হয়ে যায়।
লোকটা সব সময় এমন ঔদ্ধর্ত্য নিয়ে থাকে। পড়িয়েছে তো কি হয়েছে এভাবে বলতে হবে!
মনিকে একা তো পড়ায় নি সব সময় খোটা টা মনিকেই দিতে হবে কেনো?
তাহিকে ও তো পড়িয়েছে। তাহিকে তো কখনো একটু কথাও শোনায় না।
এজন্যই তাহিকে সহ্য হয়না। মনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে থমথমে মুখ নিয়ে বের হয়।
শাহাদ ওটির বাইরে অপেক্ষা করছে। হামজার সদ্য বিয়ে করা বউ আর মা বসে আছে পাশে।
শাহাদ একবার তাকিয়ে পুনরায় পাভেল, লাবিবের দিকে তাকায়।
হামজা, পাভেল, তুহিন এরা প্রত্যেকে শাহাদের জন্য কাজ করে।
কোথাও কোনো অরাজকতা দেখা দিলে শাহাদ এগিয়ে আসে।
জব ছেড়ে আসার পর থেকে মানুষের জন্য কাজ করে। সব উপর মহলের সাথে যোগাযোগ ভালো। অনেকেই সমীহ করে চলে। চলবে নাই বা কেনো একজন সামরিক বাহিনীর সদস্যের হাতে কি পরিমাণ ক্ষমতা এবং তথ্য থাকে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের সকলেরই জানা।
দলের আরো ছেলেরা হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে আছে।

শাহাদের কাছে হামজার মা দু হাত জোর করে বলছে,
স্যার আমার ছেলেটাকে বাঁচায় দেন।
ও তো ভালো মানুষ সকালে বাইর হইলো বললো, আমি দুপুরে তোমাকে নিয়া ডাক্তার কাছে যাব আম্মা। আর তো আসলোনা আমার ছেলে।
বিয়া হইছে আজকে সাতদিন। মেয়েটার কি হবে স্যার!
শাহাদ নিস্তব্ধ। ঠিক যে কারণে ডিফেন্স থেকে দূরে সরে এসেছে, সেই কারণে আজ হামজা হতাহত। রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। ছাড়বেনা কাউকে। দূর্নীতির কারণে হারিয়েছে প্রাণপ্রিয় ভাইসম বন্ধুকে। রাশেদকে চোখের সামনে বিনা অপরাধে তড়ফাতে দেখে সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলো এই প্রতিশোধ সে নিবে। তা জন্য দরকার প্রতিবাদ। যে প্রতিবাদের সাথে মিশে আছে রক্ত। যদি প্রয়োজন হয় তবে ঝরবে রক্ত, রাঙাবে দু হাত।

বাড়িতে আজ অনুষ্ঠান। নিশাদের গায়ে হলুদ। সারা বাড়ি আলোতে সাজানো। ফুফু মঞ্জিলা পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সঁপে দিয়েছে দিয়ার কাঁধে। আজ থেকে অতিথিদের আসা শুরু। দিয়া শাড়ি কোমড়ে বেঁধে কাজ করছে। কাজ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠছে। সুলতানার ভাই বোনেরা এসেছে, রায়হান সাহেবের ভাইবোন এসেছে। বাড়ির ছাদে হলুদের অনুষ্ঠান হবে। মেয়েরা সাজগোজ করতে ব্যস্ত। শেহজা কখনো চাচ্চুদের কোলে তো কখনো ফুফিদের কোলে। দিয়া রান্নাঘরে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। ফুফু মঞ্জিলা,চাচী শাশুড়ি ইফাত, খালা শাশুড়ি সাবিনা মুখ টিপে হাসছে। এই মেয়ে হোয়াইট সস পাস্তা বানাতে গিয়ে ফ্লোরে ময়দার ছড়াছড়ি করেছে। নিজের কপাল নিজে চাপড়াচ্ছে। এবার খালা শাশুড়ি সাবিনা নিজের থ্রিপিছের ওড়না কোমড়ে চেপে বলে,
- মা উঠ,অনেক করছিস। এতখানি একটা পুতুল মেয়ে। এত চাপ নিস না তো।

ফুফু শাশুড়ি, মামী শাশুড়ী, চাচী শাশুড়ি কাজে লেগে পড়ে। দিয়াকে পাঠিয়ে দেয় সাজগোজের জন্য। এরমধ্যে মেয়েরা ডাইনিং রুমে এসে হলুদের ডেকোরেশনের জন্য বিভিন্ন নাস্তা সাজাতে ব্যস্ত। দিয়ার হাতে গাঁদা ফুল সমেত একটা বেতের প্লেট। ফুল দিয়ার বেশ পছন্দ। খুব ইচ্ছে গাঁদা ফুলের মালা পরবে চুলে,হাতে। আজ অনেক গাঁদা আছে বাসায়।হলুদ শাড়িতে সাজবে নিজের জন্য। ফুলের প্লেট উপরে নিয়ে যাবে কনেপক্ষ আসলে শুভেচ্ছা জানাতে। নিচের দিকে তাকিয়ে ডিশে গোলাপ গুলো ছড়াতে ব্যস্ত সাথে বিমোহিত সুরে আনমনে গান গেয়ে উঠলো,
অন্তর দিলাম বিছাইয়া,বইসা লোওনা জিরাইয়া
যদি তোমার চাই মনে,পরাণ রাইখা পরানে
নয়ন রাইখা নয়নে,পরাণ রাইখা পরানে
নয়ন রাইখা নয়নে
অন্তর দিলাম বিচাইয়া,বইসা লোওনা জিরাইয়া
যদি তোমার চাই মনে,প্ররাণ রাইখা প্ররানে
নয়ন রাইখা নয়নে,প্ররাণ রাইখা প্ররানে
নয়ন রাইখা নয়নে...

অকস্মাৎ সামনে আসা মানুষটা থমকে গিয়েছে। গানের সুরে পুরো বাসা নিস্তব্ধ। এত বছরেও গান গাইতে দেখেনি কেউ এই মেয়েকে। আজ কি তবে মন খুশি আছে! শাশুড়ীরা সব ভিড় করেছে। ননদ, দেবররা সব স্তব্ধ। সকলে চমকে গিয়ে ডাইনিং রুমে মানুষটার উপস্থিতি দেখে। মনোমুগ্ধকর নয়নে তাকিয়ে আছে। অপলক সেই দৃষ্টি। দিয়া প্লেট হাতে নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটা ধরলো ড্রইং রুমের উদ্দেশ্যে। সেখানে সব তত্ত্ব রাখা। তৎক্ষনাৎ সামনে প্রবলভাবে বাঁধা গ্রস্থ হয়ে হাত ছিটকে উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে সব ফুল। নিশব্দ রুমটাতে এতক্ষন কেউ ধ্যানে ছিলো না। বেতের প্লেট নিচে সেন্টার টেবিলের উপর পড়ে ঝনঝন করে উঠলো। তাল সামলাতে না পারলে পড়ে যেতে নিলে একটা প্রশস্ত,শক্ত,অমসৃণ, খসখসে হাত উন্মুক্ত কোমড় আঁকড়ে ধরেছে। তখন শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজা, দুগালে ময়দা, চুল গুলো পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে মুড়িয়ে মাঝখানে বাঁধা। দিয়া ধরা গলায় চোখ বুঁজে বলে, ফুফুআম্মা , মামীমা আমি কি নিচে পড়ে গেলাম! কোমড় কি ভেঙেই গেলো।

আল্লাহ গো। শক্ত কিছু কি কোমড়ে বিঁধে গিয়েছে!
শিফা,নিশি ডাইনিং এর পরিবেশ দেখে থ। পেছন দিক থেকে কাজিনরা সব এসে দাঁড়িয়েছে।
সুলতানা কবির নাতনীকে নিয়ে সামনে আসতেই এমন দৃশ্য দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে।
মঞ্জিলা লজ্জা পেয়ে উলটো দিকে ঘুরে গিয়েছে জিহবায় কামড় বসালো।
শাহাদের মাথায়, চুলে,কাঁধে হলুদ গাঁদা আর লাল গোলাপ। দিয়ার শাড়ি,চুলের ও একই অবস্থা।
শাহাদ ধ্যানে ফিরে আসলো। তাকিয়ে দেখে সবাই হাসছে মুখ লুকিয়ে। নিজেকে সামলে ধমকে বললো, মুভির সিন চলছে এখানে, ষ্টুপিড। আমি কতক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো।
ছোট ভাই বোন, মা চাচীদের সামনে এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে ভাবেনি।
দিয়া তড়াক করে চোখ খুলে বলে, আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তনির রাজীম।

হাত পা একদম জমে বরফ। সামনে তো সাক্ষাৎ একটা ভয়ের রাজা। মনে মনে এই একটা লাইন জঁপেই যাচ্ছে। এই আয়াতের মানে শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়া,এই মেয়ে শয়তান কাকে বললো!! শাহাদ ক্ষেপে উঠে কোমড় থেকে হাত সরিয়ে বলে উঠলো, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সাথে সাথে দিয়া নিচে পড়ে গেলো। ওর কাজে পুরা ডাইনিং রুম হতভম্ব। এমনটা করবে কেউ ভাবতেও পারেনি। দিয়া পড়ে গিয়ে কোমড়ে ব্যাথা পেয়েছে। ছলছল চোখে শাহাদের চলে যাওয়া দেখলো। সকলে দৌঁড়ে এসে ধরলো। ভাগ্যিস কার্পেট ছিলো। নতুবা আজকে কোমড়ের অবস্থা যেরূপ হত আগামী এক মাস বিছানা ছেড়ে উঠার নাম ও নেয়া মহাপাপ হয়ে যেত৷ সাবিনা, সুলতানার দিকে তাকিয়ে বললো, বাবুর কাজটা একদম ঠিক হয়নি।মেয়েটার কোমড়ে লেগেছে।
সুলতানা ছেলের উপর চটেছে ভীষণ কিন্তু কিছু বলার ছিলোনা।বাড়িভর্তি মানুষের সামনে কিছু বলতে মন চায়নি। দিয়াকে ধরে নিয়ে শিফার রুমে বসালো। আজ থেকে দিয়া কোথায় থাকবে এটা নিয়ে শিফা,রায়হান সাহেব এবং সুলতানার মাঝে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। এই কয়েকদিন দিয়া শিফার সাথে ছিলো। মঞ্জিলা বুঝতে পারেনি।এদিক সেদিক দাওয়াত দিতে ব্যস্ত ছিলো। আজ বাড়িভর্তি মেহমান এর মধ্যে শাহাদের এমন একটা কাজ লজ্জাজনক। দিয়াকে রুমে বসিয়ে শিফা আইসব্যাগ নিয়ে আসতে ছুটলো। নিশি পাশে বসে বলছে, ভাবীমা, তোমার খুব লেগেছে।

দিয়ার খুব হাসি পাচ্ছে। কিভাবে বলবে ঠিক কতটা লেগেছে। সি সেকশন করা পেট। ভারী কাজ করতে পারেনা। অপারেশনের পর থেকে পেছনের মেরুদন্ড অনেক ব্যাথা করে সেখানে মানুষটা এতটা নির্দয় না হলেও তো পারতো।সন্তানের মা হিসেবে একটু দয়া দেখাতো। বুকে এক আকাশ সব কষ্ট নিয়ে নিশিকে বললো, নিশি, ভাবী ঠিক আছি। চিন্তা করোনা। একটু ব্যাথা লেগেছে।
শিফা দৌঁড়ে এসে দিয়ার কোমড়ের ডান পাশে আইসব্যাগ ধরলো। কিছুক্ষন পর দিয়া তাড়া দিলো সকলকে রেডি হয়ে উপরে যাওয়ার জন্য। দিয়া যাবেনা। কেউ জোর করতে পারছেনা।

সুলতানা,সাবিনা যাবেনা বলাতে দিয়া বকা দিয়ে পাঠালো উপরে। সকলে উপরে যাওয়ার সময় দিয়াকে বাসার একটা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দিলো।কিছুক্ষন পর আফিয়া খালা আসবে। বাসার দরজায় তালা দিয়ে গেলো। বিয়ের আমেজে ভরা বাড়িটা এক নিমেষে অন্ধকার,শূন্য বাড়িতে পরিণত হলো। আশে পাশে,দৃশ্যমান উপরে নিচে কেউ নেই। শুধু সাত আসমানের উপর রক্ষাকারী রব্বুল আলামিন বসে আছে। দিয়ার দুচোখে আজ অশ্রুধারা। মনে পড়ে গেলো সেই রাতের কথা, যে রাতে প্রথম এই বাড়িতে পা দিয়েছিলো। বিয়ের আগে একবার ও ছবি দেখেনি শাহাদের। চাচা দেখাতে চেয়েছিলো। বিয়ের দিন গাড়ি থেকে নামার সময় সাহায্য করেছিলো ননদ শিফা। হেঁটে ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত এলো। শাহাদ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। মা সুলতানার অনুরোধে সদ্য সঙ্গী হওয়া স্ত্রীকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিলো। তখনই দিয়া সরাসরি দেখতে পেলো স্বামীর মুখ।

দিয়া প্রথমবারের মতো শাহাদ ইমরোজের হ্যাজেল আইয়ের প্রেমে পড়ে গেলো। এমন ধূসর রঙা চোখের মানুষ খুব কম দেখা যায়।ইংরেজদের চোখ এমন থাকে। দিয়ার চোখ তো কুচকুচে কালো তবে উনার চোখ এত আকর্ষণীয় কেন! দিয়াকে নিয়ে নিজের বেডরুমে প্রবেশ করলো। এত বড় গুছানো বেডরুম দিয়া আগে দেখেনি। শাহাদ সরাসরি বিছানায় বসিয়ে দিয়েছে। দাদা বাড়িতে শয়ন কামরা ছিলো পুরনো আসবাবে ঘেরা। সেখানে ছিলো ঐতিহ্যের ছোঁয়া, আর এখানে আভিজাত্যের। এরপর বাড়ির সবাই এসে বাকি নিয়ম কানুন সব পালন করেছে।

রাত বারোটার দিকে শাহাদ ঢুকেছে। দিয়ার গায়ে বিয়ের পোশাক জড়ানো দেখে পরিবর্তন করতে বললো। দিয়া উঠে শাহাদকে সালাম করতে চাইলে শাহাদ বাঁধা দিয়ে মমতায় মাথায় রাখে।
ঘোমটা সরিয়ে কপালের মাঝখানটাতে অধর মিলিত উষ্ণ পরশ দিয়ে বললো, ভালো থাকো, বয়সটা খুব কম তোমার। ভেবেছিলাম বিয়েটা করবোনা এত ছোট মেয়েকে কিন্তু যখন শুনলাম তোমার মাথার উপর কারো শক্ত ছায়া নেই তখন আর ইচ্ছে করেনি তোমাকে একা এই কঠিন পৃথিবীতে লড়াই করতে নামিয়ে দিতে। পারবেনা এই মানুষটাকে স্বামী হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে!
দিয়া উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। যাও পোশাক ছেড়ে আরামের কিছু পরো।
এরপর লাগেজ থেকে একটা ড্রেস বের করে চলে গেলো ওয়াশরুমে। শাহাদ ও পরিবর্তন করে পাশে এসে বসেছে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে অন্য রকম একটা মায়া কাজ করছে। কিন্তু নিজের কাছে ব্যাপারটা বড্ড বেমানান লাগছে। হাঁসফাঁস করছে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, তোমার পুরো নাম কি?

ফারাহানা মেহতাব দিয়া।
আমার নাম জানো?
দিয়া দু পাশে নাড়ালো। শাহাদ হেসে বলে,
আমাকে বিয়ের আগে দেখেছো?
দিয়া পুনরায় দু পাশে মাথা নাড়ালো। শাহাদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,
তবে? বিয়েতে মত দিলে কিভাবে?
মত না দিলে চাচা যদি আরো বয়স্ক কারো সাথে বিয়ে দিত এরচেয়ে আপনি বেটার অপশন ছিলেন।
শাহাদ হো হো করে হেসে উঠলো। মজা করে বললো,
এই প্রথম আমাকে কেউ অপশন হিসেবে বেছে নিয়েছে।
দিয়া উজ্জ্বল নেত্রে তাকিয়ে আছে। শাহাদ মুচকি হেসে বলে, আমার নাম শাহাদ ইমরোজ। আপাতত বেকার। বাবার টাকায় খাচ্ছি। মা*রামা*রি করতে বেশ ভালো লাগে। এজন্য আব্বু মাঝে মাঝেই রাগ করে। এখন কারো রাগের ধার ধারিনা। তবে তুমি রাগ করোনা। রাগ হলে জানাবে। ভাঙিয়ে নেব সকল মান অভিমান। এত সাবলীলভাবে গুছিয়ে বাবার পর কেউ কথা বলেছে কিনা ওর সাথে মনে পড়ছেনা। দিয়া মুখ ফসকে বলে ফেলে, আপনি অনেক সুন্দর।

শাহাদ চোখ বড় করে পুনরায় হেসে উঠে বলে, তুমিও অনেক সুন্দরী। ওহ হ্যাঁ ভালো কথা, তুমি চাইলে আমাকে তুমি করে বলতে পারো। না না ছিঃ। কি বলছেন এসব। আপনি এত বয়সের একজন কিভাবে আপনাকে তুমি বলি।
বয়স্ক বললে?
না, আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমার বান্ধবীরা আপনাকে দেখলে হিংসা করবে।
তাই নাকি, তাহলে একদিন বান্ধবীদের দাওয়াত দাও।
কেনো?
দিয়ার ড্যাব ড্যাব করা চাহনীতে শাহাদ হেসে উঠে। চোখ ঝাপটে বলে,
তোমার এমন মধ্যবয়সী স্বামী দেখে যদি কেউ হিংসে করে তাহলে আমার একটু শান্তি লাগবে কারণ সবাই তো আমাকে বলে আমার নাকি বাবা হওয়ার বয়স পেরিয়ে দাদার বয়স হয়ে গিয়েছি। আব্বু তো মাঝে মাঝে রেগেই যায় আমার একরোখা স্বভাবের জন্য।

আব্বুকে না রাগালেই পারেন।
শাহাদের একটা দীর্ঘশ্বাস।
বাবাকে রাগিয়ে সবচেয়ে কঠিনতর কাজটা ছ' মাস আগেই করে ফেলেছে।
তবে গোপনে রেখেছে সত্যটা।
কোমড়ের ব্যাথাটা চিনচিন করে উঠলে পুরনো কথা ভুলে নড়ে বসে দিয়া।
বামপাশটাতে হালকা কেটে গিয়েছে বেতের প্লেটটা লেগে।
ওটা বোধ হয় শিফা,নিশি খেয়াল করেনি।
দিয়া পরে উঠে অয়েন্টমেন্ট লাগাবে ভেবে পুনরায় শুয়ে পড়লো।
একা বাড়িতে কিছুটা ভয় করছে। একটু পর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলো।

বন্ধ নেত্রে বিছানায় শুয়ে আছে, রাজ্যের চিন্তা মাথায় হানা দিয়েছে। একটু ঘুমানো দরকার। কিন্তু ঘুমাবে কি করে! পুরোনো ব্যাথা শরীরে কাঁটা দিচ্ছে।দেখেছিলো দুঃসাহসী স্বপ্ন,ধরা দিলো দুঃস্বপ্ন হয়ে। ঘুম না আসাতে উঠে বসে। ড্রয়ার থেকে মেডিকেল কিট বের করে রুম থেকে বের হয়৷ পুরো বাড়ি এখন নিঃসঙ্গ। শাহাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ভাবলো, ' আম্মু সত্যি বলে প্রতিটি স্ত্রীর বটবৃক্ষ দরকার। অসুস্থ অবস্থায় এতক্ষন হলো মেয়েটা রুমে অথচ কেউ আসলোনা। আমি কেনো পারলাম না একা রেখে যেতে! নিজেকে ধিক্কার জানাতে চেয়েও পারেনি।

তস্ত্রপায়ে হেঁটে আবজানো দরজা খুলে দেখে বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন রমনী। কোমড়ের পাশের আঁচলটা সরিয়ে সেলফোনের আলোতে তাকিয়ে দেখে অনেকটা কেটেছে৷ জায়গাটা ফুলে আছে। তৎক্ষনাৎ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেলো নেত্রযুগল। বুকের ঠিক মাঝখানটায় চিনচিনে ব্যাথা।একটি দীর্ঘশ্বাস। বিকেল থেকে এখন অবধি প্রায় সাত ঘন্টা অতিবাহিত হলো। অথচ কোনো অয়েন্টমেন্ট এখনো লাগানো হয়নি, না কোনো ব্যান্ডেজ।জায়গাটা রক্তে লালচে হয়ে আছে। এন্টিসেপটিক বের করে ক্ষ*ত স্থান মুছে দিলো। ব্যান্ডেজ করতেই কেঁপে উঠলো দিয়া। শাহাদ ধীরহস্তে ব্যান্ডেজ শেষ করে ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিলো ব্যান্ডেজের উপর। বিকেলেই দেখেছে কেটে যাওয়ার সময়। আলতো হাতে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললো, এমন ভুল করলে বউ যার কলঙ্ক মেটাতে অগ্নি পরীক্ষা তোমার স্বামীকে দিতে হচ্ছে। না পারছি কাছে টানতে,না পারছি দূরে ঠেলতে। একবার, শুধু একবার হাতের নাগালে পাই ওকে। কথা দিলাম তোমাকে করা প্রতিটি আঘাত নিজেকে করবো আর দ্বিগুনের বেশি ফিরিয়ে দিব ওদের। সম্পর্ক ভুলে যাব।

চলবে...

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url